নিউজ প্রবাসী ডেক্স :
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে বড় ধরনের পতনের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। একই সময়ে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ও ভিয়েতনামের রপ্তানি বেড়েছে। ফলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান অফিস ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ইইউর ২৭ দেশে বাংলাদেশ ১ হাজার ৩৭ কোটি ২৮ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২০১ কোটি ২১ লাখ ইউরো। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
এই সময়ে ইইউর বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠান বিশ্ববাজার থেকে মোট ৫ হাজার ১৬১ কোটি ৩৭ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক আমদানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই আমদানি কমেছে ৫ দশমিক ১০ শতাংশ। অর্থাৎ সামগ্রিক বাজার সংকুচিত হওয়ার চেয়ে বাংলাদেশ থেকে আমদানি কমেছে দুই গুণেরও বেশি হারে।
অন্যদিকে চীন থেকে ইইউর পোশাক আমদানি বেড়েছে ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ। জানুয়ারি-জুলাই সময়ে দেশটি ১ হাজার ৬৪২ কোটি ১৭ লাখ ইউরোর পোশাক রপ্তানি করেছে। ভিয়েতনামের রপ্তানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ, যার পরিমাণ ২৫৫ কোটি ১৮ লাখ ইউরো।
শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের পর তুরস্কের রপ্তানি কমেছে ১৩ দশমিক ৩২ শতাংশ। ভারতের কমেছে ১২ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ১১ দশমিক ৮১ শতাংশ। এছাড়া কম্বোডিয়ার ৬ দশমিক ৬৯, মরক্কোর ৬ দশমিক ৭২, শ্রীলঙ্কার ১১ দশমিক ৮৩ এবং ইন্দোনেশিয়ার ১২ দশমিক ১২ শতাংশ রপ্তানি কমেছে।
বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো রপ্তানির পরিমাণ ও ইউনিট মূল্য—দুই ক্ষেত্রেই পতন। জানুয়ারি-জুলাই সময়ে বাংলাদেশ ইইউতে ৭৫ কোটি ১৯ লাখ ১০ হাজার কেজি পোশাক রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ কম।
একই সময়ে চীন ৮১ কোটি ৬২ লাখ ৬০ হাজার কেজি পোশাক রপ্তানি করেছে। দেশটির রপ্তানির পরিমাণ বরং ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ বেড়েছে।
দামের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বড় পার্থক্য রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে চীন প্রতি কেজি পোশাক গড়ে ২০ দশমিক ২০ ইউরো দরে রপ্তানি করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই গড় মূল্য ১৩ দশমিক ৮০ ইউরো। বাংলাদেশের পোশাকের গড় রপ্তানি মূল্য গত বছরের তুলনায় ৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ কমেছে।
পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, বিশ্ব পরিস্থিতির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যার প্রভাবও রপ্তানিতে পড়ছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
ইইউর বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কমার পেছনে ভোক্তা পর্যায়ে চাহিদা কমে যাওয়া, চীনের আগ্রাসী বিপণন এবং ভারতের সঙ্গে ইইউর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কারণে ক্রয়াদেশের একটি অংশ ভারতে চলে যাওয়ার বিষয়গুলোও কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ইইউর ব্যবসায়ীরা সামগ্রিকভাবে পোশাক কেনা কমিয়েছেন। তবে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ও ভিয়েতনামের রপ্তানি বাড়ায় বিষয়টি আরও উদ্বেগের।
তার মতে, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশের রপ্তানি কমার হার বেশি থাকলেও জুন ও জুলাইয়ে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বছরের বাকি সময়ে কী পরিস্থিতি দাঁড়ায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
ইউরোপের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ ৪৬৫ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ কম। তবে এই বাজারে বাংলাদেশ দ্বিতীয় শীর্ষ পোশাক সরবরাহকারী হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের বড় অংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। ফলে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রধান বাজারগুলোতে রপ্তানি কমে যাওয়ায় দেশের পোশাক শিল্পের সামনে প্রতিযোগিতা, মূল্য ও বাজার ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts