নিউজ প্রবাসী ডেক্স :
দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন গন্তব্য কক্সবাজারে বিদেশি নাগরিকের আনাগোনা থাকলেও তাদের কতজন প্রকৃতপক্ষে পর্যটক হিসেবে আসেন, সেই হিসাব নেই সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থার কাছেই। জেলা প্রশাসন, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, হোটেল-মোটেল ব্যবসায়ী কিংবা পর্যটন করপোরেশন—কেউই বছরে বিদেশি পর্যটকের নির্ভরযোগ্য সংখ্যা দিতে পারছে না।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও রোহিঙ্গা শিবিরসংশ্লিষ্ট কাজে আসেন। কেউ স্থানীয়ভাবে বাসা ভাড়া নিয়ে, আবার কেউ হোটেল-মোটেলে অবস্থান করেন। কাজের ফাঁকে তারা বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে গেলেও তাদের পর্যটক হিসেবে আলাদাভাবে গণনা করা হয় না।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আ. মান্নান জানান, বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে অনেকেই উন্নয়ন প্রকল্প, আন্তর্জাতিক সংস্থা কিংবা রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংশ্লিষ্ট কাজে আসেন। পর্যটনের উদ্দেশ্যে আসা বিদেশিদের আলাদা করে শনাক্ত করার কোনো ব্যবস্থা নেই জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলেও।
কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও বিদেশি পর্যটকদের পৃথক পরিসংখ্যান রাখা হয় না। বিমানবন্দরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, বিদেশি নাগরিকদের যাতায়াতের তথ্য থাকলেও কে পর্যটক আর কে অন্য কাজে এসেছেন, তা আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয় না। তবে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখ করার মতো বেশি নয় বলে জানান তিনি।
পুলিশের কাছেও কিছু বিদেশি নাগরিকের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য থাকে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মো. ফিরোজ কবির বলেন, নির্দিষ্ট কিছু দেশের নাগরিকের অবস্থান ও সংশ্লিষ্ট তথ্য পুলিশের কাছে দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে সেটিও কক্সবাজারে পর্যটনের উদ্দেশ্যে আসা বিদেশিদের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নয়।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের হোটেল শৈবালের ব্যবস্থাপক রায়হান উদ্দিন আহমেদ বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ‘খুবই নগণ্য’ বলে উল্লেখ করেন। তার মতে, আন্তর্জাতিক পর্যটন গড়ে তুলতে শুধু হোটেল থাকলেই হয় না; মানসম্মত সেবা, বিনোদন, পার্ক, সিনেমা হল, নাইট লাইফ ও নিরাপত্তার মতো সুযোগ-সুবিধাও প্রয়োজন।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আব্দুল শুক্কুর বলেন, দেশীয় পর্যটকের ব্যাপক সমাগম থাকলেও আন্তর্জাতিক পর্যটনের চিত্র ভিন্ন। বিদেশি পর্যটক বাড়াতে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলা, বিদেশি এয়ারলাইনকে সুবিধা দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রচার বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ শোয়েব উর রহমানের মতে, বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের আগে কক্সবাজারের অবকাঠামো ও পর্যটন-পরিবেশ উন্নত করা জরুরি। একই সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কক্সবাজারের বৈশ্বিক ব্র্যান্ডিংয়ের পরামর্শ দেন তিনি।
পর্যটন বিশেষজ্ঞ নুসরাত জাহান বিদেশি পর্যটকদের উপযোগী পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতিকে পর্যটন পণ্যে পরিণত করার ওপর গুরুত্ব দেন। বাউল সংগীত, জামদানি-মসলিন, চিত্রকর্ম ও স্থানীয় খাবার ঘিরে আয়োজনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের বিনোদনকেন্দ্র, পরিকল্পিত নাইট মার্কেট ও সৈকতকেন্দ্রিক ডাইনিংয়ের কথা বলেন তিনি।
তবে বেসরকারি ইকো-রিসোর্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিদেশি পর্যটক একেবারেই নেই—এমন নয়। মারমেইড ইকো রিসোর্টের ব্যবস্থাপক রানা কর্মকার জানান, তাদের রিসোর্টে বিদেশি পর্যটক আসেন এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের ইকোটুরিজমের প্রচার তাদের আকৃষ্ট করতে ভূমিকা রাখছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু বা অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি নিরাপত্তা, আধুনিক পরিবহন ও আন্তর্জাতিক মানের বিনোদন নিশ্চিত করা জরুরি। তবে এসব উদ্যোগের আগে কক্সবাজারে প্রকৃত বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা নিরূপণ করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।