ইউরোপের স্বপ্নে বিভীষিকা: হাঙ্গেরিতে প্রাণ গেল ফেনীর প্রবাসীর, দালালচক্রের ফাঁদে নিঃস্ব পরিবার। পাঁচ বছরের ছোট মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে শেষবার যখন ঘর ছেড়েছিলেন ফরিদুর রহমান (৩২), তখন চোখে ছিল ইউরোপে নতুন করে ভাগ্য ফেরানোর রঙিন স্বপ্ন। কিন্তু দালালচক্রের হাত ধরে ইতালির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে সেই স্বপ্ন যে হাঙ্গেরির গহীন জঙ্গলে সলিলসমাধি লাভ করবে, তা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি তাঁর পরিবার।কয়েকটা দেশ পেরিয়ে, পাহাড়-জঙ্গল আর সীমান্তের কড়া নজরদারি এড়িয়ে অবৈধ পথে ইউরোপে ঢুকতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে অবশেষে হাঙ্গেরির এক হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন এই বাংলাদেশি যুবক।

নিহত ফরিদুর রহমান ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার জায়লস্কর ইউনিয়নের পূর্ব বারাহীগুনী গ্রামের সফি ডাক্তার বাড়ির মফিজুর রহমানের ছেলে। তিনি আগে সৌদি আরবে ছিলেন, বছরখানেক আগে দেশে ফেরেন।নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, দেশে স্থায়ী কিছু করতে না পেরে স্থানীয় দালালচক্রের প্রলোভনে পড়েন ফরিদুর। চুক্তি হয় ১৮ লাখ টাকায় তাঁকে নিরাপদে ইতালিতে পৌঁছানো হবে। সেই অনুযায়ী পরিবার জমি-জমা বেচে আর দেনা করে টাকা তুলে দেয় দালালের হাতে। গত ১৬ জুন তিনি দেশ ছাড়েন।

দালালদের ছক অনুযায়ী, প্রথমে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় দুবাই। সেখান থেকে নর্থ মেসিডোনিয়া ও সার্বিয়া হয়ে সড়কপথে হাঙ্গেরি সীমান্তে ঢোকানো হয়। পুলিশি গ্রেপ্তার এড়াতে হাঙ্গেরির গহীন জঙ্গলে খাবার ও পানি ছাড়াই দিনের পর দিন তাদের আটকে রাখা হয়। এতে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন ফরিদুর। একপর্যায়ে দালালরা তাঁকে হাঙ্গেরির একটি হাসপাতালে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

ফরিদুরের ভাই কাজী নজরুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “গত ২৪ জুন ফরিদুরের সঙ্গে আমাদের শেষ কথা হয়েছিল। এরপর মোবাইল বন্ধ পেয়ে স্থানীয় দালাল দুলালের বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিলে সে জানায় ফরিদুর হাসপাতালে ভর্তি আছে। কথা বলা যাবে না। এরপর থেকে দালাল দুলাল আত্মগোপনে চলে যায়। গত সোমবার হঠাৎ দাগনভূঞা থানা-পুলিশ বাড়িতে এসে ফরিদুরের মৃত্যুর খবর দেয়।”

বিশেষ প্রতিনিধি, দাগনভূঞা (ফেনী):

এ বিষয়ে দাগনভূঞা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ ফয়জুল আজীম জানান, পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ঠিকানা যাচাইয়ের নির্দেশ পাওয়ার পর পুলিশ নিহতের বাড়িতে গিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করেছে এবং পরিবারকে মৃত্যুর বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। নিহতের লাশ বর্তমানে হাঙ্গেরির একটি হাসপাতালের মর্গে রয়েছে।

দাগনভূঞা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহীদুল ইসলাম বলেন, “হাঙ্গেরিতে দাগনভূঞার যুবকের মৃত্যুর খবরটি মর্মান্তিক। নিহতের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনা বা অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয়ে পরিবারটিকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।”

নিঃস্ব পরিবারটির এখন একটাই দাবি—উপার্জনক্ষম মানুষটিকে তো আর ফেরত পাওয়া যাবে না, তবে তাঁদের অকাল মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া দালাল দুলালসহ পুরো চক্রটিকে যেন দ্রুত গ্রেপ্তার করে কঠিন শাস্তির আওতায় আনা হয়।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts