নিউজ প্রবাসী ডেক্স :
ভাগ্যের পরিবর্তনের আশায় ২০২০ সালে কম্বোডিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন পাবনার সুজানগরের পারঘোড়দহ গ্রামের যুবক আল-আমিন। সেখানে কাজ করতে গিয়ে ২০২৫ সালের ১২ এপ্রিল সিহানুক সিটিতে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি। মৃত্যুর পর প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও নানা প্রশাসনিক জটিলতায় এতদিন দেশে ফেরেনি তার মরদেহ।
রোববার দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে থাই এয়ারওয়েজের টিজি-৩২১ ফ্লাইটে আল-আমিনের মরদেহ ঢাকায় পৌঁছানোর কথা ছিল। স্বামীর মরদেহ গ্রহণ করতে শনিবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান স্ত্রী মুন্নি খাতুন। তবে শেষ মুহূর্তে ব্যাংককে বন্যার কারণে ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় তাকে মরদেহ ছাড়াই বাড়ি ফিরতে হয়।
বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের উপপরিচালক শরিফুল ইসলাম জানান, থাইল্যান্ডের ব্যাংককে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বন্যার কারণে ফ্লাইটটি বাতিল করা হয়েছে। থাই এয়ারওয়েজ কর্তৃপক্ষও চলমান বন্যার কারণে ব্যাংকক থেকে পরিচালিত বিভিন্ন রুটের ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিতের কথা জানিয়েছে।
মুন্নি খাতুন বলেন, ভোররাত ৩টা ৪০ মিনিটে তিনি বিমানবন্দরে যান। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করে বাইরে অপেক্ষা করার সময় প্রবাসী কল্যাণ অফিস থেকে ফোন করে ফ্লাইট বাতিলের কথা জানানো হয়। পরবর্তীতে কবে মরদেহ দেশে আসবে, সে বিষয়ে তাকে নির্দিষ্ট কোনো সময় জানানো হয়নি।
স্বামীর মৃত্যুর পর দুই সন্তানকে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন মুন্নি। তার দুই ছেলের বয়স ১৫ ও ৯ বছর। তিনি জানান, এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো সহায়তা বা অনুদান পাননি। সংসার ও সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ চালাতে বর্তমানে পাবনায় টিউশনি করছেন।
আল-আমিনের শ্যালক মাসুম খান জানান, তিনি বোনকে কিছুটা সহযোগিতা করছেন। এ ছাড়া আল-আমিনের ব্যাংকে থাকা সঞ্চয়ের লভ্যাংশ দিয়ে কোনোভাবে সংসার চলছে।
মরদেহ দেশে ফিরতে এত সময় লাগার কারণ হিসেবে পরিবারটি নথিপত্র ও প্রশাসনিক জটিলতার কথা জানিয়েছে। মাসুম খান বলেন, কম্বোডিয়ায় তাদের কোনো আত্মীয় বা পরিচিত ব্যক্তি না থাকায় দুর্ঘটনার পর মরদেহ কোথায় রাখা হয়েছে এবং কী কী কাগজপত্র প্রয়োজন—এসব জানতে তাদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক আসাদুজ্জামান বলেন, বিদেশে কোনো বাংলাদেশি মারা গেলে সংশ্লিষ্ট দেশে আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। মৃত্যুর কারণ, নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট (এনওসি), ডেথ সার্টিফিকেট ও প্রয়োজনীয় ক্লিয়ারেন্স সংগ্রহ করতে হয়।
তিনি জানান, কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশের সরাসরি কোনো দূতাবাস নেই। ফলে থাইল্যান্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। মৃত ব্যক্তির বিএমইটি নিবন্ধন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঠিক থাকলে মরদেহ ফেরাতে বাধা থাকার কথা নয় বলেও জানান তিনি।
এদিকে দীর্ঘ সময় হিমঘরে থাকা আল-আমিনের মরদেহ দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়ায় বিশেষ সহায়তা করেছে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের এক কর্মকর্তা বলেন, একজন কর্মী সরকারের নিয়ম মেনে বিদেশে যাওয়ার পর মৃত্যুর ঘটনায় তার মরদেহ দেশে ফিরতে দেড় বছর সময় লাগা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে যেসব দেশে বাংলাদেশের কূটনৈতিক বা কনস্যুলার সেবা সীমিত, সেখানে কর্মী পাঠানোর আগে ঝুঁকি মূল্যায়নের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, নিরাপদ অভিবাসন শুধু বিদেশ যাওয়ার অনুমোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বিপদের সময় আইনি সুরক্ষা, মৃত্যুর পর মরদেহ দ্রুত ও মর্যাদার সঙ্গে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানোও এর অংশ। ভবিষ্যতে অন্য কোনো পরিবারকে যেন এমন দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যে পড়তে না হয়, সে জন্য নীতিগত সংস্কার ও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts