নিউজ প্রবাসী ডেক্স :
দেশের মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাসের বেপরোয়া গতি, ওভারটেকের প্রতিযোগিতা এবং ঝুঁকিপূর্ণভাবে ‘বাউলি’ দেওয়ার প্রবণতা দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও বানিয়ে জনপ্রিয়তা পাওয়ার প্রবণতা। ফলে চালকদের একটি অংশ ঝুঁকি নিয়ে বাস চালাচ্ছেন, যার খেসারত দিতে হচ্ছে যাত্রী ও পথচারীদের।
শুক্রবার সিলেট ও বগুড়ায় কয়েকটি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ১৮ জনের প্রাণহানি এই পরিস্থিতিকে আবারও সামনে এনেছে। সিলেট মহাসড়কে দুই বাসের সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন নয়জন। বগুড়ায় পৃথক দুটি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে আরও নয়জনের।
সিলেটের দুর্ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, একটি বাসকে ওভারটেক করতে গিয়ে বেঙ্গল পরিবহনের একটি বাস নিজের লেন ছেড়ে বিপরীত লেনে চলে যায়। বিপরীত দিক থেকে আসা ইউনিক পরিবহনের বাসটি সংঘর্ষ এড়াতে সড়কের পাশে সরে যাওয়ার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত দুর্ঘটনা ঘটে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতিরিক্ত গতির পাশাপাশি ভারী বডির স্লিপার বাস দিয়ে অভিজ্ঞতা ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণভাবে ‘বাউলি’ দেওয়াও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এসব বাসের অনেকগুলোর বডি উঁচু হওয়ায় দ্রুত দিক পরিবর্তনের সময় ভারসাম্য হারানোর আশঙ্কা থাকে।
বেঙ্গল পরিবহনের কর্মকর্তারাও দুর্ঘটনায় তাদের বাসচালকের গাফিলতির কথা স্বীকার করেছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পিকআপ বা অন্য যানবাহনকে ওভারটেক করতে গিয়েই বাসটি বিপরীত লেনে চলে যায়। দুর্ঘটনার পর চালক পালিয়ে যান।
অন্যদিকে বগুড়ায় দ্রুতগতির একটি বাস মোটরসাইকেলকে এড়াতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে অপেক্ষমাণ শ্রমিকদের ওপর উঠে যায়। এতে অন্তত সাত শ্রমিক নিহত হন। একই দিনে আরেকটি দ্রুতগতির বাসের সঙ্গে ট্রাকের সংঘর্ষে চালকসহ দুজন নিহত হন।
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু চালককে দায়ী করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বাসের ফিটনেস, বডি নির্মাণ, চালকের প্রশিক্ষণ, রুট পারমিট এবং মহাসড়কে চলাচল—সবকিছুর যথাযথ নজরদারি প্রয়োজন।
বুয়েটের অধ্যাপক এম শামসুল হক বলেন, দেশের পরিবহন খাতের একটি বড় অংশ এখন অনভিজ্ঞ ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মধ্যে চলছে। তার প্রশ্ন, মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর কার্যকর নজরদারি কোথায়?
তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে বাসের ঝুঁকিপূর্ণ চালনা, ওভারটেকিং এবং ‘বাউলি’ দেওয়ার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং কিছু ক্ষেত্রে এসব ভিডিও জনপ্রিয়তা পাওয়ায় চালক ও কনটেন্ট নির্মাতাদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কনটেন্ট তৈরির আগ্রহ বাড়ছে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, দেশে চলাচলকারী কিছু স্লিপার বাসের অনুমোদন ও কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কয়েক বছর ধরে এসব বাস চলাচল করলেও সেগুলোর নিরাপত্তা ও কারিগরি সক্ষমতা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে।
বাস মালিকদের একটি অংশ বলছে, বিপুল বিনিয়োগের কারণে বর্তমানে চলাচলকারী স্লিপার বাসগুলোকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ চলছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কমিটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে বলেও পরিবহন মালিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করলেই হবে না; দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে বাসে ট্র্যাকিং ব্যবস্থা, চালকের আচরণ পর্যবেক্ষণ এবং গতি নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করা জরুরি।
তাদের মতে, মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাসের গতি ও চলাচল প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারির আওতায় আনা গেলে কোন বাস কখন কোথায় অতিরিক্ত গতি নিয়েছে, বিপরীত লেনে গেছে কিংবা ঝুঁকিপূর্ণভাবে দিক পরিবর্তন করেছে—তা সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের জীবন যেখানে ঝুঁকির মধ্যে, সেখানে দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে দুর্ঘটনা ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থা কবে নেওয়া হবে?