নিউজ প্রবাসী ডেক্স :
খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়াল করে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা তুলনামূলক ভালো দেখাতে ঋণ পুনঃতফসিলের প্রবণতা বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ব্যাংক খাতে ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। আগের বছর এর পরিমাণ ছিল ৮৫ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পুনঃতফসিল বেড়েছে ৮৪ হাজার ৮২৪ কোটি টাকা বা প্রায় ৯৯ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া পুনঃতফসিল সুবিধার প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ব্যবহার না করে অনেক ব্যাংক আর্থিক প্রতিবেদন ভালো দেখানোর কৌশল হিসেবে এটি ব্যবহার করছে। এতে সাময়িকভাবে খেলাপি ঋণের চাপ কম দেখা গেলেও ভবিষ্যতে ব্যাংক খাতে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক মোস্তফা কে মুজেরি বলেন, খেলাপি ঋণ বাড়লে ব্যাংককে বেশি হারে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখতে হয়। এতে ব্যাংকের মুনাফায় চাপ পড়ে। তাই অনেক ক্ষেত্রে পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম দেখানোর প্রবণতা দেখা যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে মোট ঋণের স্থিতি ছিল ১৭ লাখ ৭৪ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে পুনঃতফসিল করা ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৫ দশমিক ১৪ শতাংশ।
একই সময়ে ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ পুনঃতফসিল করা ঋণের স্থিতি খেলাপি ঋণের প্রায় ৮০ শতাংশের সমান।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত পাঁচ বছরে ঋণ পুনঃতফসিলের পরিমাণ প্রায় সাড়ে পাঁচ গুণ বেড়েছে। ২০২১ সালে ২৬ হাজার ৮১০ কোটি টাকা পুনঃতফসিল করা হলেও ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৩ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে ৯১ হাজার ২২১ কোটি এবং ২০২৪ সালে ৮৫ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা পুনঃতফসিল করা হয়।
২০২৫ সালে এসে পুনঃতফসিলের পরিমাণ এক লাফে ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকায় পৌঁছায়।
ব্যাংকারদের মতে, পুনঃতফসিলের সুযোগ বন্ধ করে দিলে অনেক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ আরও স্পষ্টভাবে সামনে আসত। তাদের ধারণা, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে পুনঃতফসিলের সুবিধা না থাকলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১০ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারত।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান সেলিম আর এফ হোসেন বলেন, খেলাপি ঋণের পুরো চিত্র এখনো প্রকাশ পাচ্ছে না। আর্থিক প্রতিবেদন ভালো দেখাতে অনেক ব্যাংক পুনঃতফসিলে আগ্রহী হচ্ছে। তবে কোন ঋণ কতটা যৌক্তিকভাবে পুনঃতফসিল করা হয়েছে, সেটি পর্যালোচনা করা জরুরি।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এভাবে পুনঃতফসিলের হার বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে এসব ঋণের বড় একটি অংশ আবার খেলাপি হয়ে যেতে পারে।
খাতভিত্তিক হিসাবে পুনঃতফসিল করা ঋণের সবচেয়ে বড় অংশ শিল্প খাতে। ২০২৫ সালে শিল্প ঋণের ১ লাখ ৩২ হাজার ১০২ কোটি টাকা পুনঃতফসিল করা হয়েছে। এর মধ্যে বড় বা করপোরেট ঋণের পরিমাণ ৯৫ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা।
এ ছাড়া তৈরি পোশাক খাতে ১৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ, চলতি মূলধন খাতে ১৩ শতাংশ, আমদানি ঋণে ১০ দশমিক ১৯ শতাংশ, বাণিজ্যিক ঋণে ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ, নির্মাণ খাতে ৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ এবং কৃষি ঋণের ৩ শতাংশ পুনঃতফসিল করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যবসায়িক সংকট, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যা কিংবা সাময়িক আর্থিক সংকটে থাকা প্রকৃত উদ্যোক্তাদের জন্য পুনঃতফসিল সুবিধা প্রয়োজনীয় হতে পারে। তবে একই সুবিধা বারবার ব্যবহার করে ঋণের প্রকৃত ঝুঁকি আড়াল করা হলে তা ব্যাংকিং খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরির মতে, ব্যাংকগুলো পুনঃতফসিল নীতিমালা যথেচ্ছ ব্যবহার করছে কি না, তা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কারণ বারবার পুনঃতফসিল করা ঋণ শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের আর্থিক অবস্থাকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে।