নিউজ প্রবাসী ডেক্স:
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও বামপন্থি নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাকে পেছনে ফেলেছেন ডানপন্থি প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারো। তবে প্রয়োজনীয় ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পাওয়ায় সরাসরি বিজয় নিশ্চিত করতে পারেননি তিনি। ফলে আগামী ২৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফার ভোটে লুলার সঙ্গে মুখোমুখি লড়াই হবে ফ্লাভিওর।
৯৯ শতাংশ ভোট গণনা শেষে ফ্লাভিও পেয়েছেন ৪৭ দশমিক ০৩ শতাংশ ভোট। লুলার ঝুলিতে গেছে ৪৫ দশমিক ১৬ শতাংশ ভোট। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জনমত জরিপে লুলা প্রায় তিন শতাংশ ব্যবধানে এগিয়ে থাকবেন বলে ধারণা করা হলেও ভোটের ফলে সেই পূর্বাভাসের বিপরীত চিত্র দেখা গেছে।
সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিওর এই ফলাফলকে প্রত্যাশার চেয়ে ভালো হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। প্রথম দফার ফল প্রকাশের পর ব্রাসিলিয়ায় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ব্রাজিল পরিবর্তন চায় এবং ফলাফলে তিনি খুবই সন্তুষ্ট। একই সঙ্গে লুলার ওয়ার্কার্স পার্টির শাসনের অবসানের কথাও বলেন তিনি।
অন্যদিকে সাও পাওলোতে সমর্থকদের উদ্দেশে লুলা বলেন, প্রথম দফাতেই জয়ী হওয়ার বিষয়ে তিনি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। এখন দ্বিতীয় দফার জন্য নতুন করে প্রচারে নেমে সরকারের অর্জন ভোটারদের সামনে তুলে ধরবেন। তার ভাষায়, লড়াই এখন মূল পর্যায়ে প্রবেশ করেছে এবং অতিরিক্ত সময়েই জনগণের সমর্থন আদায় করতে হবে।
জরিপের হিসাব বদলে দিল ভোটের ফল
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের আগে অধিকাংশ জনমত জরিপে লুলাকে এগিয়ে রাখা হয়েছিল। কিন্তু ভোটের ফলে সেই হিসাব বড় ধাক্কা খেয়েছে। ইগারাপে ইনস্টিটিউটের সহপ্রতিষ্ঠাতা রবার্ট মুগার মতে, জরিপকারীরা বড় ধরনের ভুল করেছেন। দ্বিতীয় দফার ভোটের ক্ষেত্রেও ফ্লাভিওর জনপ্রিয়তা কম করে দেখানোর আশঙ্কা রয়েছে।
প্রথম দফায় বাদ পড়া প্রার্থীদের মধ্যে ডানপন্থি ভোটের বড় অংশ থাকায় দ্বিতীয় দফায় ফ্লাভিও সুবিধা পেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়া গভর্নর, সিনেটর ও ফেডারেল ডেপুটি নির্বাচনে ফ্লাভিওর লিবারেল পার্টি শক্তিশালী ফল করেছে। ফলে কংগ্রেসেও দলটির অবস্থান শক্ত হতে পারে।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও নিরাপত্তা বড় ইস্যু
নির্বাচনি প্রচারে ব্রাজিলের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, অর্থনীতি, দুর্নীতি ও নিরাপত্তা ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বৈষম্য ও বেকারত্ব কমলেও দ্রব্যমূল্যের চাপ, পরিবারের ঋণ এবং অপরাধ ও গ্যাং তৎপরতা নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ রয়েছে।
এই উদ্বেগকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন ফ্লাভিও। অন্যদিকে লুলা অনলাইন জুয়া নিষিদ্ধ করা, সামাজিক সহায়তা বাড়ানো এবং পরিবারের ঋণের চাপ কমানোর বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বলেছেন।
সরকারি ব্যয় ও ঋণও নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দেশটির সরকারি ঋণ জিডিপির ৮২ শতাংশের বেশি। একই সঙ্গে চলতি ও আগামী বছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে যথাক্রমে ২ শতাংশ ও ২ দশমিক ৩ শতাংশ করা হয়েছে।
দুর্নীতির অভিযোগেও উত্তপ্ত প্রচার
নির্বাচনি প্রচারে বিভিন্ন কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতির অভিযোগও সামনে আসে। ব্যাংকো মাস্টারকে ঘিরে বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় ব্যাংকটির সাবেক প্রধান দানিয়েল ভোরকারো গ্রেপ্তার হন। তার বিরুদ্ধে কয়েক বিলিয়ন ডলারের জালিয়াতির অভিযোগ আনা হলেও তিনি তা অস্বীকার করেছেন।
তদন্তে রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে ভোরকারোর যোগাযোগ খতিয়ে দেখা হয়েছে। ফ্লাভিওর বিরুদ্ধেও অর্থপাচারের অভিযোগের তদন্ত চলছে। তবে তিনি কোনো অনিয়মের কথা অস্বীকার করেছেন।
নিরাপত্তার প্রশ্নেও দুই প্রার্থীর অবস্থানে পার্থক্য রয়েছে। ফ্লাভিও গ্যাংগুলোকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা এবং সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কারাগার নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অন্যদিকে লুলা গ্যাংকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণার প্রস্তাবের বিরোধিতা করে সংগঠিত অপরাধের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া, হত্যাকাণ্ডের তদন্ত জোরদার ও কারাগারে বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কেও ভিন্ন অবস্থান
নির্বাচনে ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব এবং পররাষ্ট্রনীতিও আলোচনায় এসেছে। লুলা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্রাজিলের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করার অভিযোগ তুলেছেন। তবে দেশটির সুপ্রিম ইলেক্টোরাল কোর্টের প্রধান জানিয়েছেন, নির্বাচনে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন না করলেও ফ্লাভিওকে হোয়াইট হাউসে স্বাগত জানিয়েছেন এবং তার প্রশংসা করেছেন। ফ্লাভিও নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্রাজিলের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে চীনের সঙ্গেও বাস্তববাদী সম্পর্ক বজায় রাখার কথা বলেছেন ফ্লাভিও। যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে চীন বর্তমানে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং দেশটির সয়াবিন ও গরুর মাংস রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ বাজার।
২৫ অক্টোবর নির্ধারিত হবে বিজয়ী
লুলার সমর্থন বেশি দরিদ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চল, নিম্ন আয়ের মানুষ, ক্যাথলিক ও নারীদের মধ্যে। ২০০২ ও ২০০৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ২০২২ সালে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরেন তিনি। ওই নির্বাচনে জাইর বলসোনারোকে দুই শতাংশেরও কম ব্যবধানে হারিয়েছিলেন লুলা।
অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চল, তুলনামূলক সচ্ছল ভোটার ও ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টানদের মধ্যে ফ্লাভিওর সমর্থন বেশি। ২০২২ সালের নির্বাচনে হারের পর জাইর বলসোনারোর সমর্থকদের একাংশ ২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারি সরকারি ভবনে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। জাইর নির্বাচনে নিষিদ্ধ হওয়ার পর তার বড় ছেলে ফ্লাভিওকে প্রার্থী হিসেবে সমর্থন দেন।
ফ্লাভিও নির্বাচিত হলে তার বাবাসহ ৮ জানুয়ারির দাঙ্গায় জড়িত সমর্থকদের সাধারণ ক্ষমা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। রোববারের নির্বাচনে জাইরের স্ত্রী মিশেল বলসোনারোও সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন।
এখন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ হবে দ্বিতীয় দফার ভোটে। আগামী ২৫ অক্টোবরের সেই ভোটে লুলা নাকি ফ্লাভিও—কে দেশটির নেতৃত্বে আসবেন, তা ঠিক হবে।