নিউজ প্রবাসী ডেক্স :
সিরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের শাসনামলে মানবাধিকার লঙ্ঘন, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে অভিযুক্ত সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান হুসাম লুকার সন্ধান মিলেছে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোয়। একটি পরিত্যক্ত ফ্ল্যাটে পাওয়া ডায়েরির সূত্র ধরে দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর তার অবস্থান শনাক্ত করার দাবি করেছে বিবিসি।
আসাদ সরকারের পতনের পর দামেস্কের একটি অভিজাত পরিত্যক্ত ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালানোর সময় একটি সাধারণ নোটবুক পাওয়া যায়। নীল কালিতে লেখা ওই ডায়েরিতে ছিল ১৫৫টি ফোন নম্বর। এসব নম্বরের সূত্র ধরে শুরু হয় লুকাকে খুঁজে বের করার অনুসন্ধান।
হুসাম লুকা সিরিয়ার সাধারণ মানুষের কাছে ‘দ্য স্পাইডার’ বা ‘মাকড়সা’ নামে পরিচিত ছিলেন। আসাদ সরকারের গোয়েন্দা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ এই কর্মকর্তা দীর্ঘদিন বিরোধীদের দমন ও নজরদারির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০১১ সালে আসাদবিরোধী আন্দোলন শুরু হলে হোমসের রাজনৈতিক নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন লুকা। বিরোধীদের ওপর নজরদারি, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ওঠে।
২০১৫ সালে হোমসের আল-ওয়ায়ের এলাকায় একটি খেলার মাঠে বিমান হামলায় শিশু ও নারীসহ ২৮ জন নিহত হওয়ার ঘটনাতেও লুকার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। নিহতদের স্বজনদের অভিযোগ, হামলার লক্ষ্য নির্ধারণের পেছনে তার ভূমিকা ছিল।
পরবর্তী সময়ে লুকা আরও গুরুত্বপূর্ণ পদে উন্নীত হন এবং সিরিয়ার জেনারেল সিকিউরিটি ডিরেক্টরেটের প্রধান হন। কুখ্যাত সিদনায়া কারাগারে বন্দিদের ওপর নির্যাতন ও কারাগারটির কার্যক্রমের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
আসাদ সরকারের পতনের পর লুকার বিরুদ্ধে হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগে মামলা এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে বলে সিরিয়ার নতুন সরকারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বিবিসির অনুসন্ধানে ডায়েরিতে থাকা ১৫৫টি নম্বরের মধ্যে ৫১টি সচল পাওয়া যায়। বিভিন্ন ব্যক্তি ও চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগের পর লুকার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী ও গাড়িচালকের সন্ধান মেলে। তাদের দেওয়া তথ্য ধরে অনুসন্ধানকারীরা লুকার পালানোর সম্ভাব্য পথ হিসেবে লেবাননের দিকে নজর দেন।
পরে এক লেবানিজ কর্মকর্তার সূত্রে জানা যায়, ভুয়া পরিচয়ে রুশ পাসপোর্ট নিয়ে লুকা লেবানন হয়ে রাশিয়ায় পালিয়ে গেছেন। এরপর তার একটি রাশিয়ান ফোন নম্বরও উদ্ধার করা হয়।
ফোনে পরিচয় নিশ্চিত করার পর বিবিসি সাংবাদিক লুকার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। তবে গণহত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি নিজের অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং ফোন কেটে দেন।
পরবর্তীতে একটি সচল সিরীয় নম্বরের ডিজিটাল অবস্থান ও মেসেজিং অ্যাপের তথ্য বিশ্লেষণ করে মস্কোর উপকণ্ঠে লুকার দুটি সম্ভাব্য অবস্থান শনাক্ত করা হয়।
লুকা বর্তমানে রাশিয়ায় অবস্থান করছেন বলে অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়ার দাবি করা হলেও তাকে সিরিয়ায় ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আসাদ সরকারের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের রাশিয়া অন্য দেশের হাতে তুলে দেবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
তবে সিরিয়ায় লুকার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচার চান ভুক্তভোগীদের স্বজনরা। ২০১৫ সালের হামলায় নিহত সাত বছরের শিশু ওয়ায়েলের বাবা মোহাম্মদ তাওয়াকাতলি বলেন, তার ছেলে তখন শুধু মাঠে খেলছিল। একদিন লুকাসহ অভিযুক্তদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে—এমন আশাই এখনও ধরে রেখেছেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts